27 C
Dhaka
অক্টোবর ১৬, ২০২১

পিএইচডি গবেষকের ৩০ বছরের গরুর খামার!

নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী: প্রফেসর ড. মো. গোলাম রাহিদ ববিন (৫৫) পেশায় একজন কলেজ শিক্ষক। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগ থেকে পড়াশোনা শেষ করেন ১৯৯৮ সালে। ঝুলিতে রয়েছে পিএইচডি গবেষণা সনদ! নব্বইয়ের দশকে দেশে সর্বপ্রথম ডেইরিতে গবেষণা করেছেন বলে দাবি করছেন তিনি। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল “প্রডাকশন পারফরমেন্স এন্ড ইমপ্রুভমেন্ট অব দ্যা ক্যাটল ইন রিলেশন টু নিউট্রেশন”। সবমিলিয়ে যা পুথিগত বিদ্যার সাথে বাস্তবতার মেলবন্ধনে ধরা দেয় সফলতা ।

একইসাথে দায়িত্ব পালন করছেন রাজশাহী ডেইরি ফার্মার্স অ্যাসোসিয়েশসের সভাপতি হিসেবে। এসবের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১২ সালে প্রাণিসম্পদ দপ্তর থেকে সেরা খামারি পুরস্কার অর্জন করেন ববিন।

১৯৯০ সাল থেকে নগরীর বোয়ালিয়া থানার সপুরা আসাম কলোনী এলাকায় টিকে আছে “নাহার ডেইরি”। গত শুক্রবার (৯ জুলাই) খামারে গিয়ে দেখা যায় গরুকে খাবার দিচ্ছেন ববিন। গোয়ালা দুধ দুইয়ে দুটো পাত্রে জমা করছেন। খামারের পাশেই পেতে রাখা বেঞ্চিতে নারী-পুরুষ মিলিয়ে ৮ থেকে ১০ জন অপেক্ষা করছেন। তাদের প্রত্যেকের হাতে প্লাস্টিকের বোতল। ববিনের সত্তোর্ধ মা দুধ মেপে মেপে বোতলবন্দি করছেন। এতে তিনি বেশ স্বাচ্ছ্যন্দবোধ করেন!

খাঁটি দুধের সন্ধানে আসা দু-জন জানান, কেউ ছোটকাল থেকে এই খামারের দুধে পুষ্টি চাহিদা মিটিয়েছেন। আবার নিজের বাচ্চাদের জন্যও একই খামারের দুধ নিতে এসেছেন। এভাবেই ৩ দশকের বেশি সময় ধরে আস্থা অর্জন করেছে নাহার ডেইরি।

কথা হয় খামারের প্রতিষ্টাতা প্রফেসর ড. মো. গোলাম রাহিদ ববিনের সাথে। অনেকটা শখ আর প্রাণির প্রতি ভালোবাসা থেকেই একটা গাভী কিনেছিলেন ১৩ হাজার টাকায়। এরপর বিশ্ববিদ্যায়ে ভর্তি হয়েই পড়াশোনার পাশাপাশি আরো ৫ টি গরু কিনে নেন বাবার কাছে বায়না করে। সেই পুুঁজি আজ দাঁড়িয়েছে অর্ধকোটি টাকায়। বড় ছোট মিলিয়ে খামারে বর্তমানে রয়েছে ৩২ টি গরু। গড়ে ১২ লিটার দুধ দিচ্ছে ফ্রিজিয়ার জাতের গাভীগুলো।

দীর্ঘ সময় ধরে খামার টিকিয়ে রাখার কৌশল বিষয়ে জানতে চাইলে বেশকিছু তথ্য তুলে ধরেন ববিন। তিনি বলেন, “ডেইরি খামারের মোটাদাগে কিছু বিষয় খেয়াল রাখতে হয়। যেমন, গরুর রোগবালাই নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা ; সেই অনুযায়ী তড়িৎ পদক্ষেপ নেওয়া, খামারের পরিবেশ খোলামেলা রাখা, বাজারের কেনা খাবারের পরিবর্তে নিজেই খাবার তৈরি করা; যাতে উৎপাদনমূল্য কমে আসে, দক্ষ ও নিয়োজিত কর্মী নিয়োগ করা; যাতে গরুগুলোকে দেখেশুনে রাখে।”

এছাড়া উৎপাদিত দুধ বিক্রিতে সততার মাধমে মার্কেট ধরে রাখা। আমার খামার থেকে দীর্ঘ ২০ বছর ধরে দুধ খাচ্ছেন এমন অনেক পরিবার আছে। যারা ৫ লিটার নিতেন তারা ৮ থেকে ১০ লিটার নিচ্ছেন। দুধের মানও ভালো। এইভাবেই মূলত ৩০ বছর ধরে খামার টিকিয়ে রেখেছি। সামনে যতদিন পারব চালিয়ে যাব।

গত তিন দশকে রাজশাহী অঞ্চলের ডেইরিতে কিকি পরিবর্তন লক্ষ্য করেছেন এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, “ আগে গো-খাদ্যের দাম কম ছিল। ৩০ বছরে প্রায় খাদ্যের দাম বেড়েছে ১৫ থেকে ১৮ গুণ আর দুধের দাম বেড়েছে মাত্র ৫ থেকে ৬ গুণ। ফলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় খামারিরা চালিয়ে যেতে পারেননি। নব্বইয়ের দিকে রাজশাহীতে ছোট-বড় ৩ থেকে ৪ হাজার গরুর খামার গড়ে উঠেছিল। কিন্তু সে সংখ্যা এখন ২ থেকে ৩’শতে নেমে এসেছে। সব খামার বন্ধ হয়েছে। খামারিরা পেশা বদল করে অন্য পেশায় ঝুুঁকেছেন। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে, ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের সাথে পেরে না উঠা ছিল এর মূল কারণ। তাছাড়া খামারিদের নিজেদের কিছু ভুল ছিল। সবমিলিয়ে ডেইরিতে লাভজনক পেশা হিসেবে টিকে থাকতে পারেননি তারা। আগের বছরগুলোতে লাভ না হলেও লোকসান হয়নি। করোনার এই সময়জুড়ে আমার দুই-আড়াই লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।

বর্তমানে ডেইরি খামারিদের সমস্যা কি কি রয়েছে এবং সেখান থেকে উদ্ধারের কোন পথ আছে কিনা এমন প্রশ্নে এই প্রফেসর বলেন, রাজশাহীর ৯ টি উপজেলা ছাড়াই শুধুমাত্র মেট্রো এলাকার আড়াই’শ ডেইরি খামারির ক্ষতি হয়েছে ১২ কোটি টাকার বেশি। মহামারির শুরু থেকেই এসব খামারে উৎপাদিত প্রায় ৩০ হাজার লিটার দুধের বেশিরভাগই স্বল্পমূল্যে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। প্রতি লিটার দুধ ৪০ থেকে ৪৫ টাকা দরে বিক্রি করে উৎপাদন খরচ তুলতে হিমসিম খাচ্ছেন এখানকার খামারিরা। খামারে উৎপাদিত দুধ বিপণনের সঠিক ব্যবস্থা করা হয়নি। খামারিরা নিজ উদ্যোগে বাসাবাড়ি; ভ্রাম্যমাণ ও মিষ্টির দোকানে দুধ বিক্রি করেছেন। বর্তমানে মিষ্টির দোকান বন্ধ থাকায় গরুর খাবার কমিয়ে দিয়েছেন যাতে দুধের উৎপাদন কম হয়। হাজারো সমস্যায় জর্জরিত খামারিদের পাশে প্রশাসন কিংবা প্রাণিসম্পদ দপ্তরকে পাশে পাচ্ছেন না। এসব সমস্যা কেবল একপাক্ষিকভাবে মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। সরকার, সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও খামারিদের এগিয়ে আসতে হবে তাহলেই কেবল ডেইরি খামারকে লাভজনক হিসেবে দাঁড় করানো যাবে।

প্রফেসর ড. মো. গোলাম রাহিদ ববিনের বিষয়ে জানতে চাইলে রাজশাহী জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো: ইসমাইল হক বলেন, প্রফেসর ড. মো. গোলাম রাহিদ প্রাণিসম্পদ দপ্তরে আসেন। আমাদের সাথে ভালো সম্পর্ক রয়েছে। প্রবীন খামারি হিসেবে বিভিন্ন সমস্যা বিষয়ে আমাদের সাথে আলোচনা হয়। তিনি রাজশাহী ডেইরি ফার্মার্স অ্যাসোসিয়েশসের সভাপতি। করোনাকালে খামারিদের তালিকাতে তাদেরকেও রাখা হয়েছে। লকডাউনে খামারিরা লোকসান গুনছেন এ বিষয়টি আমরা উপলব্ধি করতে পারছি। এজন্য ভ্রাম্যমাণে দুধ-ডিম- মাংস বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তাছাড়া মিষ্টির দোকান বন্ধ, মানুষের স্বাভাবিক চলাফেরা না থাকায় দুধ বিক্রিতে সমস্যা হচ্ছে এটি অস্বীকার করা যাবেনা।

উল্লেখ্য, জেলা প্রাণিসম্পদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে জেলার ৯টি উপজেলা ও একটি মেট্রো অঞ্চল মিলিয়ে দেশী ও সংকর জাতের গাভী থেকে দুধ উৎপাদন হয়েছে ২ লাখ ৫০ হাজার ২৭ মেট্রিক টন। সদ্য বিদায়ী বছর ২০২০ সালে দুধ উৎপাদন হয়েছে ৩ লাখ ৫০ হাজার ২৬ মেট্রিক টন। ২০১৬ সালের তুলনায় জেলায় ৪ বছরে দুধ উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ১ লাখ মেট্রিক টন।

কমিউনিটি /এমএইচ

আরও সংবাদ

২৮ নভেম্বর তৃতীয় ধাপের ইউপি নির্বাচন

কমিউনিটি নিউজ

পাঁকা-নারায়ানপুর ফেরীঘাটে অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে মানববন্ধন

কমিউনিটি নিউজ

মহাদেবপুরে স্বাস্থ্যসেবার নামে রমরমা ব্যবসা

কমিউনিটি নিউজ

করোনা শনাক্তের হার বেড়েছে

কমিউনিটি নিউজ

চাকরি ছেড়ে মিশ্র ফল চাষে ভাগ্য ফিরেছে ইঞ্জিনিয়ার তুষারের

কমিউনিটি নিউজ

মান্দায় মাদক ব্যবসায়ীর ছুরিকাঘাতে যুবক আহত, মামলা নেয়নি পুলিশ

কমিউনিটি নিউজ