33 C
Dhaka
মে ১৫, ২০২১

বিদ্যুৎস্পৃষ্টে ভেঙ্গেছে মিনহাজের স্বপ্ন

মিনহাজ

হাসনাত হাকিম: পদ্মার ভাঙ্গন দিয়েছে উদ্বাস্তুর পরিচয়। আর করোনা দিয়েছে দূর্বিসহ জীবন। প্রতি এক-দু বছর পর পর নতুন করে ভাঙ্গা-গড়ার খেলার সঙ্গে ভাগ্যাকাশে নতুন মেঘের কালো ছায়া। সুদিনের অপেক্ষায় বুনতে হয় নতুন করে বেঁচে থাকার স্বপ্ন। দিনমজুর বাবার ছয় সদস্যের পরিবারে স্বচ্ছলতা ফিরে আসা অনেকটা স্বপ্নের মতোই। আর সেই স্বপ্নের সারথি হতেই চেয়েছিলো ১৩ বছরের কিশোর মিনহাজ। তবে স্বপ্নের সারথি হতে চাওয়া এই কিশোর এখন পরিবারের বোঝা। যদিও বাবা-মা’র কাছে তার বেঁচে থাকায় অনেক বড় পাওয়া।

মিনহাজের বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জ শিবগঞ্জ উপজেলার চরপাকা গ্রামে। বাবা এরফান আলী ও মা রোজিনা বেগমের আদরের একমাত্র ছেলে সন্তান সে। গত তিন মাস আগে বাবার সংসারে কিছুটা স্বচ্ছলতা আনায় প্রয়াসে প্রতিবেশী কয়েকজন যুবকের সঙ্গে কাজের উদ্দ্যেশে সে চট্টগ্রাম যায়। সেখানে গিয়ে সে কাজও পায়। কিন্তু পদ্মার ভাঙ্গনের চেয়ে বড় বিপর্যয় নেমে আসে তার জীবনে। বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি মেডিকেলে ভর্তি করা হয়।

সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে গত আড়াই মাসের অধিক সময় ধরে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের চিকিৎসা চলে তার। কিছুটা সুস্থ হওয়ায় ডাক্তার মেডিকেল ছাড়ার ছাড়পত্র দিয়েছে। তবে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসাটা অনেকটাই অনিশ্চিত তার। কেননা এরই মধ্যে তার চিকিৎসা করাতে গিয়ে নিঃস্ব হয়ে ঋণী হয়ে পড়েছে তার পরিবার। অথচ সামনে তার উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন কর্তব্যরত ডাক্তার।

মিনহাজের মা রোজিনা বেগম জানান, তাদের কোন স্থায়ী আবাস নেই। পদ্মার ভাঙ্গনে দু’এক বছর পর পর তাদের বাড়ি ভেঙ্গে যায়। আবার জেগে ওঠা চরে তারা ঘর বাঁধেন। তবে যেখানেই বসবাস করুক না কেন ঠিকাদারকে টাকা দিতে হয়। তাদের সম্পদ বলতে বাবার দু-হাত ছাড়া এখন আর তেমন কিছুই নেই।

তার তিন মেয়ে এবং একমাত্র ছেলে মিনহাজ। বড় মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। বাকি দুই মেয়ের একজন সপ্তম শ্রেণি এবং অপরজন প্রথম শ্রেণিতে আর মিনহাজ অষ্টম শ্রেণিতে উঠেছে। তার স্বামী গ্রামে গ্রামে গিয়ে ‘হরেকমাল’ বিক্রি করেন। করোনা পরিস্থিতি আর সন্তানের চিকিৎসা করাতে গিয়ে জমানো সামান্য পুঁজি হারিয়ে সে এখন ঋণগ্রস্ত। পরিশোধ করতে পারবে কি না? এমন শঙ্কায় এখন তাকে নতুন করে কেউ ধারও দিচ্ছে না। এতে তাদের মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে। চিন্তাগুলোও কুরে কুরে খাচ্ছে।

মিনহাজের বাবা এরফান আলী জানান, করোনাকালে মিনহাজের স্কুলবন্ধ। অভাবের সংসারে সে বসে থাকতে চায়নি। তাই গ্রামের প্রতিবেশিদের সঙ্গে চট্টোগ্রামে রাজমিস্ত্রির কাজে যায়। যে দিন কাজে যায় সেদিন খবর পায় মিনহাজ বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়েছে। একমাত্র ছেলের বেঁচে থাকাটাই তাদের কাছে অনেক। তারা এমন সংবাদ পাওয়ার পর আঁতকে উঠেন। কয়েকদিন পর তারা মিনহাজকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে রাজশাহীতে নিয়ে আসে। এরপর তাকে রামেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

গত শনিবার (২৪ এপ্রিল) চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে রামেক হাসপাতালে আসে মিনহাজসহ তার মা-বাবা। তারা জানায়, দুই মাসের দীর্ঘ চিকিৎসা শেষে ডাক্তার তাদের ছুটি দিয়েছে। কোনো সমস্যা হলে দেখা করতে বলেছে। মিনহাজের অবস্থা তেমন ভালো না। ক্ষতগুলো শুকাচ্ছে না। বিশেষ করে হাতের অবস্থা আরো খারাপ। তাই তারা আবার নিয়ে এসেছেন।

তারা আরো জানান, এখন পর্যন্ত মিনহাজের চিকিৎসায় প্রায় দেঢ় লক্ষাধিক টাকা খরচ হয়ে গেছে। সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্যে করা সঞ্চয় আর ব্যবসার সামান্য পুঁজি ফুরিয়ে তারাএখন ঋণগ্রস্ত। তারা কারও কাছে তেমন কোন সহযোগিতা পাননি। স্থানীয় মেস্বার, চেয়ারম্যানের কাছে ধরণা দিয়েও কোনো গতি হয়নি। বরং মিনহাজের প্রাথমিক চিকিৎসার ৮ হাজার টাকা তার ছেলেকে কাজে নিয়ে যাওয়া লোকজন যাচ্ছে। হাসপাতাল থেকেও মেলেনি তেমন কোনো সহযোগিতা।

রামেক হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের বিভাগীয় প্রধান মোসা. আফরোজা নাজনিন আশা জানান, রামেক হাসাপাতালে মিনহাজের মতো আরো অনেক অসহায় রোগি আসে। তাদেরকে হাসপাতাল থেকে ওষুধসহ আরো অনেক সহায়তা দেয়া হয়। মিনহাজকে দামি বেশকিছু ইনজেকশন সরকারিভাবে ফ্রি দেয়া হয়েছে। সমাজসেবা থেকেও কিছু ওষুধ ফ্রি দেয়া হয়েছে। তাদের পক্ষ থেকে যতটুকু করার তা তিনি করেছেন। আর দীর্ঘ সময় ধরে হাসপাতলে চিকিৎসা নেয়ার পর সে এখন শারীরিকভাবে অনেকটাই সুস্থ। তবে সামনে তার হাতের জন্য উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন।

শিবগঞ্জ চরপাঁকা ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার মো. তরিকুল ইসলাম বলেন, পরিবারটি ভূমিহীন এবং খুবই অসহায়। শুনেছি এরফানের ছেলেটা কাজে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হয়। দীর্ঘদিন চিকিৎসা শেষে বাসায় এসেছে। এখন তারা ঋণগ্রস্ত ও মানবেতর জীবনযাপন করছে। আসলে চরাঞ্চলের মানুষ অনেক সুযোগ সুবিধা বঞ্চিত। তাদের জন্য নিজের তরফ থেকে যেটুকু করা যায় করব। তবে মেম্বার হিসেবে তার তেমন কিছুই করার নাই। এদিকে চরচক ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পরিবারটির খোঁজ খবর নিয়ে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন।

কমিউনিটিনিউজ/ এমএএইচ

আরও সংবাদ

করোনায় জুয়ায় ঝুঁকে পড়ছে শিশুরা

কমিউনিটি

দিনাজপুরের বিখ্যাত কাটারীভোগ ধান

কমিউনিটি

রাজশাহী অঞ্চলে বেড়েছে আউশ আবাদের লক্ষ্যমাত্রা

কমিউনিটি

ঈদের পূর্ববর্তী সময় পর্যন্ত অটোরিক্সায় শিফটিং নিয়ম শিথিল হোক

কমিউনিটি

গ্রামাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়েছে করোনা

কমিউনিটি

চলনবিলের নদী বাঁচলে প্রান্তজন বাঁচবে

কমিউনিটি