30 C
Dhaka
আগস্ট ২, ২০২১

চলনবিলের নদী বাঁচলে প্রান্তজন বাঁচবে

  • ফাত্তাহ তানভীর রানা

ঢাকা পোস্ট পত্রিকায় গত ১৯ মার্চ, ২০২১ ‘খননে অনিয়ম ‘অস্তিত্ব হারাচ্ছে চলনবিলের নদী’ সংবাদটি আমার নজর কাড়ে। সম্পাদকীয় ও সংবাদটি পড়ে আমি হতভম্ব হয়ে পড়ি! নদী খননে প্রকাশ্য দিবালোকে অনিয়ম চলছে আর আমরা নির্বাক দর্শক! আমাদের করার কিছুই নেই?

  • নদী আমাদের কাছে মায়ের মতোই। নদী শুধু দিয়ে যায়, বিনিময়ে কিছুই দাবী করে না। নদী আমাদের দিয়েছে অনেক করেছে ঋণী। অবগাহন-চৈত্র গাত্রদাহন থেকে শুরু করে অনেক কিছুই! এই নদী আমাদের সভ্যতার বিকাশে অনেক অবদান রেখেছে। নদীকে নদীর মতো বাঁচতে দেয়া উচিৎ। নদী রক্ষার জন্য বিশ্বের বিভিন্ন আদালত বিভিন্ন নির্দেশনা দিচ্ছেন। পরিবেশের জন্য নদী খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই নদী রক্ষার গুরুত্ব নিয়ে এখন সবাই কথা বলছে।

চলনবিলের মধ্য দিয়ে বেশ কয়েকটি নদী প্রবাহিত হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- করতোয়া, আত্রাই, গুড়, গুমানী, নারদ, হুরাসাগর, বাংগালী, বড়াল, মরা বড়াল, নন্দকুঁজা, তুলসী, ভাদাই, চিকনাই, বরোনই, মুসা খাঁ, তেলকুপি ইত্যাদি। এই নদীগুলোকে ঘিরেই এক সময় গড়ে উঠেছিল বাঘাবাড়ী, কলম, গুরুদাসপুর, নলডাংগা, আহসানগঞ্জ, মির্জাপুর, ভাঙ্গুড়া, বড়াল ব্রীজ, ফরিদপুর, গোবিন্দপুর ঘাট, সিংড়া, চাঁচকৈড়, বিলদহর, হালসা, দয়রামপুর, নাজিরপুর, ছাইকোলা এর মতো বড় বড় বাজার। চলতো রমরমা ব্যবসা। সেই সময় নদীতে বছর জুড়েই পানি থাকতো। বাজারগুলিতে ব্যবসা-বাণিজ্য বেশ ভালোই চলতো। বছরের পর বছর পলি পড়ে, আর ড্রেজিং না করার কারণে নদী এখন খালে পরিণত হবার পথে।

সময়ের সাথে সাথে নদী হারিয়েছে তার সৌন্দর্য আর জৌলুস। এখন বর্ষাকালে নদী পানিতে ভরে থাকলেও বর্ষা শেষ হলে পানির দেখা মেলে না; পানি শুকিয়ে যায়। চলনবিলের নদীতে অনেক আগেই বছরজুড়ে নিয়মিত নৌ চলাচল বন্ধ হয়েছে। অথচ নদীগুলোতে একসময় লঞ্চ চলতো! নদী দখল আর বর্জ ফেলে ভরাট করার কারণে নদীপথ সংকুচিত হয়েছে। নদীকেন্দ্রিক কর্মজীবী মানুষ হয়েছে বেকার, তারা পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছে। প্রভাবিত হয়েছে ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষি জমিতে সেচ কাজ ব্যাহত হয়েছে; প্রতিবেশ ব্যবস্থা আর মত্স সম্পদ পড়েছে হুমকির মুখে।

  • নাটোর চিনিকলের বর্জ্যে নারদ ও নন্দকুঁজা দূষিত হয়, গুমানীসহ অন্যান্য নদীও প্রভাবিত হয়। বর্জ্যের প্রভাবে নদীর পানি বিষিয়ে ওঠে, এতে নদীর পানি নষ্ট হয়ে যায়। পরিবেশ ও প্রতিবেশ ব্যবস্থা প্রভাবিত হবার পাশাপাশি পচা পানিতে শুধু মাছই নয়, মারা যাচ্ছে অন্যান্য জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণী। নদী তীরবর্তী জনপদের মানুষ সেচ, স্নানসহ ঘর-বাড়ীর কাজে এখন নদীর পানি ব্যবহার করতে পারছে না। দূষিত পানি ভুল করে কেউ ব্যবহার করলে আক্রান্ত হচ্ছেন পানিবাহিত রোগে। সবার অবহেলায় চলনবিলের নদীগুলো আজ মৃত প্রায়। প্রকাশ্যেই তিলে তিলে নদীর মৃত্যু ঘটছে।

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট ডিভিশনের ২০১৯ সালের একটি রায়ে দেশের নদীগুলোকে জুরিসটিক পার্সন হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। হিউম্যান রাইটস এন্ড পিস্ ফর বাংলাদেশ নামের সংগঠনের রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে তুরাগ নদীকে লিভিং এনটিটি ঘোষণা করা হলেও পরে দেশের সকল নদীর ক্ষেত্রে এই রায় বহাল রাখা হয়। এই যুগান্তকারী রায়ের মাধ্যমে নদীর মৌলিক অধিকার স্বীকৃত হয়েছে, যা জীবন্তসত্তা হিসেবে একজন মানুষ সাংবিধানিক অধিকার ভোগ করে থাকেন।

আদালতের ঘোষণা অনুযায়ী, দেশের নদ-নদীগুলো এখন থেকে প্রাণী যেমন কিছু আইনগত অধিকার ভোগ করে; তেমনি অধিকার নদীও ভোগ করবে। নদীর প্রতিনিধি হয়ে কেউ আদালতে ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি জানালে নদী প্রতিকার পাবে। বিশ্বব্যাপী নদীর আইনগত সত্তা ধারণার সূচনা হয়েছে কলম্বিয়ার আদালতের একটি রায় থেকে। নিউজিল্যান্ডসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিশেষ বিশেষ নদীকে লিগ্যাল পারসন ঘোষণা করা হয়েছে। আমাদের পাশ্ববর্তী দেশ ভারতের মধ্যপ্রদেশের রাজ্য আদালত থেকে নর্মদা নদীকে লিভিং এনটিটি ঘোষণা করা হয়েছে।

চলনবিলের অনেক নদীতে ড্রেজিং শুরু হয়েছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। মূলতঃ নদীর নাব্য বৃদ্ধি, সেচ কাজ আর মাছের প্রজননের জন্যই নদী খনন করা কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে। কিন্ত, ড্রেজিং নিয়ানুসারে হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। নদী খনন সঠিকভাবে না হলে এর কোন সুুুফলই পাবে না চলনবিলের প্র্রান্ত্তিক মানুুুষ। তাই, নদীগুলি রক্ষার জন্য সুশীল সমাজসহ স্থানীয় পৌরসভা, স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড, পরিবেশ অধিদপ্তর, নদী রক্ষা কমিশন একক অথবা যৌথ ভূমিকা রাখলে চলনবিলের নদীগুলো ফিরে পেতে পারে তার হারানো রূপ।

জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন দেশের নদ-নদী, খাল-বিল, জলাশয় রক্ষার অভিভাবক। নদীগুলোকে জুরিসটিক পার্সন হিসেবে ঘোষণা করার পর নদ-নদী রক্ষায় আদালতেরও ভূমিকা বেড়েছে। চলনবিলের নদীগুলোর হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে দূষণ-দখল প্রতিরোধ করাসহ কল-কারখানার বর্জ্য যেন নদীর পানিতে না মিশতে পারে, এজন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। তবেই চলনবিলের জীববৈচিত্র ও কৃষককূল রক্ষা পাবে।

লেখকঃ গল্পকার ও কবি।
fattahtanvir@gmail.com

আরও সংবাদ

ভাড়া পাচ্ছে না ‘গরিবের অ্যাম্বুলেন্স’

কমিউনিটি নিউজ

মাছ কেটে ৩০ বছর সংসার চালান তুজিন

কমিউনিটি নিউজ

করোনায় অসহায়দের ঈদ সামগ্রী দিলো ‘এইচআর একাডেমি’

কমিউনিটি নিউজ

‘সংগ্রাম’ করে বাঁচতে হচ্ছে শামুখখোল পাখিদের

কমিউনিটি নিউজ

মাস্ক খুললেই ছটপট করছেন সেতারুন নেসা

কমিউনিটি নিউজ

রাজশাহী নগরীতে উপচে পড়া ভিড়, উপেক্ষিত স্বাস্থ্যবিধি

কমিউনিটি নিউজ