33 C
Dhaka
মে ১৫, ২০২১

বাংলাদেশী চলচ্চিত্রের নবউন্মীলনে চাই সরকারি উদ্যোগ

  • ফাত্তাহ তানভীর রানা

বাংলা ভাষায় নির্মিত কালজয়ী, বাবসাসফল ও আলোচিত সিনেমাগুলো সাধারণ দর্শকদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্যেই প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসে আমার ভাষার চলচ্চিত্র উত্সবের আয়োজন করা হয়। মাত্র ৩০ টাকা মূল্যের টিকিটে দেখানো হয় প্রতিটি চলচ্চিত্র; যা সবার জন্য উন্মুক্ত থাকে। উত্সবে দর্শকদের প্রচণ্ড উত্সাহ  থাকলেও সিনেমা হলে দর্শক পাওয়া ভার! করোনাকালে আমার ভাষার চলচ্চিত্র উত্সব আয়োজিত না হাওয়ায় চলচ্চিত্রপ্রেমী দর্শকরা উত্সবমুখর পরিবেশে বাংলা ভাষায় নির্মিত ভালো সিনেমাগুলি উপভোগ করা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।

ঢাকা ইউনিভার্সিটি ফিল্ম সোসাইটি’র আয়োজনে টিএসসি’তে ১৯ তম আমার ভাষার চলচ্চিত্র উত্সব-১৪২৬ অর্থাৎ সর্বশেষ আয়োজনের কথাই ধরা যাক না।উত্সবে সারাদিনে চারবারে স্বল্পদৈর্ঘসহ মোট বাইশটি সিনেমা প্রদর্শিত হয়েছে। উত্সবে যে সকল সিনেমা প্রদর্শিত হয়েছে, তার বাইরেও অনেক দর্শকনন্দিত-সুপারহিট সিনেমার পোস্টার হলের (অডিটোরিয়াম) বাইরে শোভা পেয়েছে। জীবন থেকে নেয়া, বেদের মেয়ে জ্যোস্না, নবাব সিরাজুদ্দৌলা, রক্তাক্ত বাংলা, অবুঝমন, বাঁধনহারা, নিশান, মুখ ও মুখোশ, ছুটির ঘন্টা, ময়না মতি, ডাকু মনসুর, লড়াকু, রূপবান, দেবদাস, লাভ ইন শিমলা, আরাধনা, বধূবিদায়, অঙ্গার, চাঁদের আলো ইত্যাদি ছবির পোস্টার দেখে পুরাতন দর্শকরা ফিরেছেন নস্টালজিয়ায়, আর নতুনরা ভাবছেন আমাদের অতীত কত উজ্জ্বল ছিল।আমি উপভোগ করলাম যৌথ প্রযোজনার নির্মিত সিনেমা `সত্তা’। সিনেমা দেখার আগে সিনেমা হলে ঢোকার সময় চোখে পড়ার মত লম্বা লাইন ছিল!! হঠাৎ সিনেমা হলের ভেতরে বেজে উঠল শিস! সব মিলিয়ে মনে হয়েছিল আগের সেই সিনেমা হলেই এসেছি। হাউসফুল শো, হাউসফুল উপভোগ। কে বলেছে বাংলাদেশী সিনেমার দর্শক নেই? টিএসসিতে সিনেমা দেখলেই বুঝতেন ভালো সিনেমা এবং সিনেমা হলের ভালো পরিবেশ পেলে এখনো দর্শকরা হলে গিয়ে সিনেমা দেখতে পারেন।আমাদের পাশের দেশ ইন্ডিয়াতে ভালো সিনেমা দর্শক হলে গিয়েই উপভোগ করে।

দেশে সিনেমা হলের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হ্রাস পাওয়া এবং দর্শকদের সিনেমা হলের প্রতি বিমুখতা আজ সবাইকে ভাবিয়ে তুলছে। আক্ষেপ করে বলতেই হয়, রাজশাহীর মতো প্রাচীন শিক্ষানগরীতেও নেই কোনো সিনেমা হল। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের পথ কোনটি হতে পারে? সরকারি অনুদানের সিনেমার সংখ্যা বৃদ্ধি এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা বৃদ্ধি করা যেতেই পারে। এক্ষেত্রে প্রবীণ ও পরীক্ষিত নির্মাতাদের অগ্রাধিকার থাকতে পারে। পাশাপাশি তরুণ ও মেধাবী নির্মাতাদেরও সুযোগ করে দিতে হবে।

দর্শকদের সিনেমা হলে ফেরানোর প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে বাংলাদেশের প্রতিটি জেলায় ডিসি অফিস এবং জেলা শিল্পকলা একাডেমির উদ্যোগে পুরাতন সিনেমা প্রদর্শন করা যেতে পারে। যেহেতু বিষয়টি ব্যবসায়িক, সিনেমা হল কর্তৃপক্ষ অথবা প্রযোজক-পরিবেশক সমিতি দায়িত্ত্ব নাও নিতে পারেন। তাই সরকারি সংস্থাকেই এগিয়ে আসতে হবে। বাংলা ক্ল্যাসিক ও পুরাতন ছবি বয়স্কদের দেবে আনন্দ, তেমনি নতুন প্রজন্মের দর্শকদেরও সিনেমা হলে টানতে পারবে। এ ক্ষেত্রে দর্শকদেরও ভূমিকা রয়েছে। তাঁদের ভালো মানের সিনেমা হলে গিয়ে দেখার মানসিকতা রাখতে হবে।

দর্শকদের হলে ফেরানোর দীর্ঘমেয়াদী ভাবনায় বলতে হয় বাণিজ্যিক সিনেমা তৈরিতে ব্যাংক থেকে বিনা সুদে ঋণ প্রদান করা যেতে পারে। এই ঋণ কে পাবেন তার সিদ্ধান্ত দেবেন কমিটি। আর কমিটিতে চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞ ব্যক্তিরাই থাকবেন। তাঁরা হতে পারেন সিনিয়র পরিচালক-পরিবেশক, সিনিয়র অভিনেতা, গল্পকার-লেখক। অন্য শিল্প যদি বিনা সুদে ঋণ পায়; সুদ মওকুফ সুবিধা পায়, তবে এ সুবিধা চলচ্চিত্র শিল্প পাবে না কেন? আমাদের পাশের দেশ ইন্ডিয়া সিনেমা ব্যবসা করে সারা পৃথিবীতে। তা’ তাদের বিনোদনের পাশাপাশি আয়ের বড় উত্স বটে। তাহলে আমরা তাদের মত ভাবতে দোষ কোথায়?

আমরা জানি এই পেশায় রয়েছে প্রচ্ছন্ন অনিশ্চয়তা। তাই, বয়স্ক শিল্পীদের অভিনয়ের শেষ বয়সে পেনশনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তাতে মেধাবী আর নতুন ভালো শিল্পীরা অভিনয়সহ চলচ্চিত্রের অন্যান্য কাজকে পেশা হিসেবে নিতে আগ্রহী হবেন। প্রসঙ্গত বলি, নতুন কুঁড়ি ও অন্যান্য শিশু শিল্পীরা কিন্ত অনেকেই অভিনয় অথবা সংগীতকে পেশা হিসেবে নেননি। আবার, সিনেপ্লেক্স তৈরীতে খাস জমিগুলো আগ্রহী ব্যক্তিদের নিকট লিজ দিয়ে সরকার সহায়তা করতে পারে। এতে করে দীর্ঘমেয়াদী ইতিবাচক প্রভাব পড়বে চলচ্চিত্রে।

বাংলাদেশী সিনেমা মৌলিক গল্পের, মানসম্পন্ন, সার্বজনীন হলে এমনিতেই দর্শকপ্রিয়তা পাবে। এর সাথে চলচ্চিত্রে ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করলে আমাদের চলচ্চিত্রের মান হবে সুন্দরতম। বাণিজ্যিক সিনেমা বানাতে হবে দর্শকদের চাহিদার কথা বিবেচনা করেই। বিদ্যমান সিনেমা হলের পরিবেশ সাউন্ডসিস্টেমসহ আমূলে সংস্কার করা উচিত। সিনেমাহল হবে নারীবান্ধব, আমাদের দর্শকদের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ নারী ও শিশু।

আমাদের চলচ্চিত্র সিস্টেমকে আধুনিক করতে হলে সিনেমাতে গ্রেডেশন চালু করা যেতে পারে। চলচ্চিত্রে সুবাতাস বইতে শুরু করলে কাটপিস সিনেমা, কপি-পেস্ট সিনেমা নির্মাণ এমনিতেই বন্ধ হয়ে যাবে। আবার, বিদেশী ভাষার চলচ্চিত্র বাংলাদেশে হলগুলিতে যত্রতত্র প্রদর্শন আমাদের সিনেমা জন্য অশনিসংকেত। উল্লেখ্য, বিভিন্ন সময়ে বিদেশী ভাষার চলচ্চিত্র বাংলাদেশে হলগুলিতে প্রদর্শনের পরে ব্যবসায়িক সফলতা লাভ করেছে। তাই, হল মালিক এবং কর্তৃপক্ষ বিদেশী ভাষার চলচ্চিত্র প্রদর্শনের ব্যপারে আগ্রহী। এজন্য একটা নতুন নীতিমালা থাকা উচিৎ। সংস্কৃতি বিনিময় চুক্তির অধীনে বিদেশী ভাষার চলচ্চিত্র বাংলাদেশ আমদানি করবে, যদি বাংলাদেশী সিনেমা তাদের দেশ আমদানি করে।

চলচ্চিত্র সেন্সরবোর্ড গঠন করতে হবে সিনেমা বিষয়ে অভিজ্ঞতা রয়েছে এমন ব্যক্তিদের নিয়ে। অশ্লীল, মানহীন, নকল, আমাদের সংস্কৃতির সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সিনেমার ক্ষেত্রে চলচ্চিত্র সেন্সরবোর্ডকে শক্তিশালী ও জোরালো ভূমিকা পালন করতে হবে। পাশাপাশি সৃজনশীল, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক, সমাজসংস্কারমূলক, বিজ্ঞাননির্ভর, শিশুতোষ, বাঙালি সংস্কৃতির সাথে সম্পৃক্ত এমন বিশ্বজনীন চলচ্চিত্র নির্মাণে উত্সাহিত করতে হবে।

আমাদের সংস্কৃতিকে বাঁচাতে হবে এবং মেলে ধরতে হবে বিশ্বব্যাপী। সংস্কৃতি বাঁচলে বাঁচবে দেশ। সুস্থ সংস্কৃতি আমাদের আগামী প্রজন্মকে আলোর পথ দেখাবে। আমাদের সংস্কৃতির অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম চলচ্চিত্র। ১৭৫৭ সালের পলাশী যুদ্ধ, ১৯৪৭ সালের দেশ ভাগ, ফকির বিদ্রোহ, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধসহ বিভিন্ন সময়ের ইতিহাস বিভিন্নভাবে ফুটে উঠেছে আমাদের চলচ্চিত্রে। বাংলাদেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতির বিভিন্ন দিক বিভিন্নভাবে চলচ্চিত্রে ধারণ করেছেন আমাদের চলচ্চিত্রকারেরা। তাই, আমাদের নিজেদের স্বার্থেই চলচ্চিত্রকে ফেরাতে হবে পুরাতন ঐতিহ্যে।

১৯৫৭ সালের ৩ এপ্রিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদে চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন (এফডিসি) গঠনের প্রস্তাব উত্থাপন করেন। ৩ এপ্রিল স্মরণ করে ২০১২ সালে প্রথমবার জাতীয় চলচ্চিত্র দিবস উদযাপন করা হয়। একই দিন ৩ এপ্রিল বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএফডিসি) প্রতিষ্ঠা দিবস। চলচ্চিত্রপ্রেমী দর্শক হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র দিবসে সবার চাওয়া বাংলাদেশী চলচ্চিত্রে ফিরে আসুক সোনালী দিন;  যা হবে আমাদের অতীতের চেয়ে বর্ণাঢ্যময়। আর এজন্য চাই সরাসরি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, সরকারি উদ্যোগ। তথ্য মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, সংষ্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং এফডিসি-কে যৌথভাবে এগিয়ে আসতে হবে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশত বর্ষে আমাদের চাওয়া গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার বাংলাদেশী চলচ্চিত্রের নবউন্মীলনে জোড়ালো ভূমিকা পালন করুণ।

লেখক: গল্পকার ও কবি

আরও সংবাদ

স্বপ্নের ঠিকানা পাচ্ছে চারঘাটের আরও ১০ পরিবার

কমিউনিটি

আড়াই’শ পরিবারের পাশে বাঘা উপজেলা চেয়ারম্যান লাভলু

কমিউনিটি

করোনায় জুয়ায় ঝুঁকে পড়ছে শিশুরা

কমিউনিটি

ঈদের বাজার করে বাড়ি ফেরা হলো না পাভেলের

কমিউনিটি

দিনাজপুরের বিখ্যাত কাটারীভোগ ধান

কমিউনিটি

বিদ্যুৎস্পৃষ্টে ভেঙ্গেছে মিনহাজের স্বপ্ন

কমিউনিটি