28 C
Dhaka
আগস্ট ২, ২০২১

স্বজনদের কান্নায় থমকে আছে রামেক হাসপাতাল

নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী, হাসনাত হাকিম: রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে ক্রমই বাড়ছে করোনা সংক্রমণ। প্রতিদিন নতুন মৃত্যুর সঙ্গে তৈরি হচ্ছে শঙ্কাও। নিত্যনতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছেন হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা সংশ্লিষ্টরা। এমন পরিস্থিতিতে হাসপাতালের কোভিড ওয়ার্ডে ডিউটি করতে অনেক চিকিৎসক ও নার্স অনাগ্রহ প্রকাশ করছেন।

এদিকে হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে কিছুক্ষণ পরপর স্বজনের আহাজারি শোনা যায়। হাসপাতালে আনার পর জরুরি বিভাগে কিংবা করোনা ওয়ার্ডে মৃত্যু হচ্ছে কারও কারও। এতমতাবস্থায় করোনা রোগীদের স্বজনদের কান্নায় থমকে গেছে রামেক হাসপাতাল। কান্নার আহাজারি বাড়ছে রোগী-স্বজনদের।

মঙ্গলবার হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, করোনার ইউনিটগুলোতে আক্রান্ত রোগীর সেবায় ব্যস্ত সময় পার করছেন স্বজনরা। প্রায় সব রোগীর মুখে অক্সিজেন মাস্ক। অনেক রোগী নাভিশ্বাস ছাড়ছেন। কয়েকজন রোগীকে হাসপাতালের বারান্দায় চিকিৎসা দিতে দেখা গেছে।

এদিকে আজ মঙ্গলবার করোনা সংক্রমণ ও উপসর্গ নিয়ে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে গত ২৪ ঘন্টায় আরও ১৯ জন মারা গেছেন। এদের মধ্যে করোনায় ৮ জন, ১০ জন উপসর্গ নিয়ে এবং করোনা নেগেটিভ সত্ত্বেও অন্য শারীরিক জটিলতায় মারা গেছেন আরও একজন।

২৪ ঘণ্টায় যে ১৯ জন মারা গেছেন এদের মধ্যে ৬ জনের বাড়ি রাজশাহী জেলায়। এ ছাড়া নাটোরের তিনজন, নওগাঁর তিনজন, পাবনার তিনজন, চাঁপাইনবাবগঞ্জের ‍দুজন, সিরাজগঞ্জের একজন এবং বগুড়ার একজন করে মারা গেছেন। করোনা সংক্রমণ ও উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে এসেছিলেন তারা।

২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ তিনজন করে গেছেন রামেক হাসপাতালের ৩, ৪ ও ১৭ নম্বর ওয়ার্ডে। এ ছাড়া নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্র (আইসিইউ), ১৪, ২৯ ও ৩০ নম্বর ওয়ার্ডে দুজন করে এবং ১, ১৫, ১৬ ও ২৫ নম্বর ওয়ার্ডে একজন করে মারা গেছেন।

২৪ ঘণ্টায় করোনা সংক্রমণে মারা গেছেন রাজশাহীর ৪ জন, চাঁপাইনবাবগঞ্জের একজন, নওগাঁর একজন, নাটোরের একজন এবং বগুড়ার একজন। এ ছাড়া উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া ১০ জনের মধ্যে পাবনার তিনজন, রাজশাহীর দুজন, নাটোরের দুজন, নওগাঁর একজন এবং সিরাজগঞ্জের একজন রয়েছেন।

করোনা নেগেটিভ হয়েও অন্যান্য শারীরিক জটিলতায় মারা যাওয়া একমাত্র রোগী নওগাঁ জেলার বাসিন্দা।

হাসপাতাল সূত্র জানায়, ৪৫৪ শয্যার করোনা ইউনিটে মঙ্গলবার সকাল ৯টা পর্যন্ত রোগী ভর্তি রয়েছেন ৫০৫ জন। এর মধ্যে আইসিইউতে ভর্তি রয়েছেন ২০ জন। করোনা নিয়ে এ পর্যন্ত ভর্তি রয়েছেন ২৪১ জন।

এ ছাড়া উপসর্গ নিয়ে ভর্তি রয়েছেন ১৯৮ জন। করোনা ধরা পড়েনি হাসপাতালে ভর্তি ৬৫ জনের নমুনায়। এ ছাড়া ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৬৩ জন। এই এক দিনে হাসপাতাল ছেড়েছেন ৭৬ জন।

রামেক ল্যাবে নমুনা পরীক্ষা হয়েছে ৪৩০ জনের। এর মধ্যে করোনা ধরা পড়েছে ১৪৩ জনের নমুনায়। পরীক্ষার অনুপাতে  হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া রোগীর ৩৪ থেকে ৩৪ শতাংশই করোনা ইউনিটের। যেটা আরও বৃদ্ধির শঙ্কা প্রকাশ করছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

হাসপাতালের ২২ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন মায়ের সেবা করছিলেন সঞ্জিব কুমার সাহা।  তিনি জানান, তাদের বাড়ি পাবনার ইশ্বরদীতে। গত দুই মাস দিন ধরে হাসপাতালে। হাসপাতালে চিকিৎসক ও নার্সদের সেবা ভালো পাচ্ছেন। তবে যাতায়াতে বেশি ভাড়া গুনতে হয়। পাবনা থেকে প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা শুধু ভাড়া গুনতে হয়েছে তাদের। টোটাল খরচ হয়েছে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ হাজার মত।

হাসপাতালের ২২ নম্বর করোনা ওয়ার্ডে ভর্তি আরেক রোগীর স্বজন জানান, তার বাবাকে এক সপ্তাহ আগে ভর্তি করেছেন। প্রথমদিকে অবস্থা খারাপ থাকলেও এখন ভালো। তার স্যালাইন চলছে। কিন্তু তিনি স্থির থাকছেন না। কয়েকবার হাত থেকে রক্তও ঝরেছে। তাই বেড থেকে নামিয়ে বারান্দায় রেখেছেন।

তিনি আরও জানান, হাসপাতাল থেকে বেশ কিছু ওষুধ ও ইনজেকশন সরবরাহ করা হয়। গত সাত দিনে প্রায় ৩০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে তার। করোনা ইউনিটে রোগীদের খাবার থেকে শুরু ব্যবস্থাপনা সুন্দর। তবে মাঝেমধ্যে নার্সদের ডাকলে আসেন না। আন্তরিক চিকিৎসক আছেন।

এদিকে কোভিড ওয়ার্ডে যেন ডিউটি দেয়া না হয় সে লক্ষে নিজেদের বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরছেন। হাসপাতালের পরিচালকের কাছে একাধিক আবেদন পড়েছে। জনবল সঙ্কটের মধ্যে হাসপাতালের করোনা পরিস্থিতি বিবেচনায় ‘খোঁড়া অজুহাতে’ ছুটি কিংবা ডিউটি করতে অনাগ্রহ প্রকাশ করা কর্মীদের মধ্যে আস্থা ও সাহস ফিরিয়ে দিতে সক্রিয় হাসপাতাল পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম ইয়াজদানী।

হাসপাতাল সূত্র জানায়, বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়া মোট রোগীর প্রায় ৪০ শতাংশের উপরে করোনা রোগী। প্রতিদিনই করোনা ইউনিটে ১৫ থেকে ২০ জন করে মারা যাচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে এমন মৃত্যু দেখে আসছেন চিকিৎসা সংশ্লিষ্ট ডাক্তার, নার্সরা। তারা আতঙ্কিত থাকছেন। ‘যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম’ তারা করোনা ওয়ার্ড থেকে দূরে থাকতে চান। আবার যারা একাধিকবার করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন তারাও এ ওয়ার্ড থেকে দূরে থাকতে চান।

জানা গেছে, কিছু দিন ধরে রাজশাহী বিভাগের আট জেলায় দৈনিক গড়ে দুই থেকে আড়াইশ করোনা রোগী শনাক্ত হচ্ছেন। এদের অধিকাংশই প্রাতিষ্ঠানিক চিকিৎসার বাইরে আছেন। গুরুতর রোগীরাও হাসপাতালে এসেও আইসিইউ সুবিধা না পেয়ে অনেকেই মারা যাচ্ছেন। গুরুতর রোগীর স্বজনরা বলছেন, রাজশাহীতে আইসিইউর তীব্র সংকটের কারণে আক্রান্ত অনেককে বাঁচানো যাচ্ছে না।

স্বাস্থ্য দপ্তর বলছে, রাজশাহী বিভাগে তিনটি হাসপাতালে ৫১টি নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) বেড রয়েছে। এর মধ্যে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আছে ২০টি। এর মধ্যে ১০টি সংরক্ষিত আছে ভিআইপি ও অন্যান্য রোগীর জন্য। বাকি ১০টি চালু আছে করোনা রোগীদের জন্য।

ভুক্তভোগীরা বলছেন, সবসময় দু/একটি খালি থাকলেও প্রভাবশালী কারও সুপারিশ ছাড়া রাজশাহী মেডিকেলে আইসিইউ পাওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

জানা যায়, কয়েকমাস আগে করোনা ওয়ার্ডে ডিউটি করতে চায় না এমন নার্সদের নির্দিষ্টকারণসহ আবেদন করতে বলা হয়েছিলো। সেখানে অনেকেই বিভিন্ন ‘অজুহাত’ দেখিয়ে করোনা ওয়ার্ডে ডিউটি করতে আগ্রহ প্রকাশ করেননি।

নাম না প্রকাশে একাধিক রোগী ও তাদের স্বজন জানান, হাসপাতালে আইসিইউ ছাড়া করোনা ওয়ার্ডে ডাক্তারের দেখা খুবই কম পাওয়া যায়। দুইবারের বেশি ডাক্তারের দেখা পাওয়া যায় না বললেই চলে। নার্সদের ডেকেও তারা আসতে চান না। একাধিকবার অনুরোধ করলে আসেন। তারা ওয়ার্ডের আয়াদের দিয়ে কাজ করান।

হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ড ঘুরে একমাসের পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, করোনা ওয়ার্ডের ডাক্তার ও নার্সদের জন্য আলাদা রুম আছে। প্রয়োজন ছাড়া তারা বাইরে আসেন না। প্রয়োজন হলে নার্সদের রুমের বাইরে দাঁড়িয়ে রোগীর স্বজনের অনুরোধের কথা শোনেন। দুর্ব্যবহারের একাধিক অভিযোগও রয়েছে। ওয়ার্ডে রোগিদের অক্সিজেন মাস্ক পরিধানসহ তার পরিমাপ নির্ধারণের কাজও করতে দেখা গেছে ওয়ার্ডবয় ও আয়াদের।

এই পরিস্থিতিতে হাসপাতালের পরিচালক নিজে প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা হাসপাতালের পুরো ওয়ার্ড ঘুরে রোগিদের সঙ্গে কথা বলছেন। রোগীদের সমস্যার কথা শুনে তা সামধানে নির্দেশ দিচ্ছেন। পরিবর্তিত পরিস্থিতে ডাক্তার-নার্সসহ চিকিৎসা সংশ্লিষ্টদের বিভিন্নভাবে অনুপ্রাণিত করছেন। এছাড়া ‘অজুহাতে’ ছুটি চাওয়া কর্মীদের দাবিও ফিরিয়ে দিচ্ছেন। এতে অনেকেই তার প্রতি মনক্ষুন্ন হচ্ছে বলে জানা যায়।

কমিউনিটিনিউজ/ এমএএইচ

আরও সংবাদ

ভাড়া পাচ্ছে না ‘গরিবের অ্যাম্বুলেন্স’

কমিউনিটি নিউজ

মাছ কেটে ৩০ বছর সংসার চালান তুজিন

কমিউনিটি নিউজ

পুঠিয়ায় ২০ কেজি গাঁজাসহ আটক ১

কমিউনিটি নিউজ

রামেক হাসপাতালে ১১ জনের মৃত্যু

কমিউনিটি নিউজ

করোনায় অসহায়দের ঈদ সামগ্রী দিলো ‘এইচআর একাডেমি’

কমিউনিটি নিউজ

‘সংগ্রাম’ করে বাঁচতে হচ্ছে শামুখখোল পাখিদের

কমিউনিটি নিউজ